স্বতন্ত্র পরিচালকের সংখ্যা আরো বাড়িয়ে এক-তৃতীয়াংশ করার প্রস্তাব দিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। গত বৃহস্পতিবার এ-সংক্রান্ত করপোরেট সুশাসন বিধিমালা ২০২৬-এর খসড়া প্রকাশ করেছে সংস্থাটি। খসড়া প্রস্তাবের বিষয়ে দুই সপ্তাহের মধ্যে অংশীজনদের মতামত দিতে বলা হয়েছে। এসব মতামত পর্যালোচনার পর বিধিমালাটি চূড়ান্ত করা হবে।
প্রস্তাবিত করপোরেট সুশাসন বিধিমালায় তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর পর্ষদে পেশাদার তদারকি নিশ্চিত করতে বেশকিছু নির্দিষ্ট মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছে। এক্ষেত্রে পরিচালনা পর্ষদের সদস্য সংখ্যা সর্বনিম্ন পাঁচ এবং সর্বোচ্চ ২০ হতে হবে। তবে এসএমই প্লাটফর্মের কোম্পানির ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সদস্য সংখ্যা ১০ হতে পারবে। প্রতিটি পর্ষদে অন্তত একজন নারী পরিচালক থাকা বাধ্যতামূলক। স্বতন্ত্র পরিচালক ব্যতীত অন্য সব উদ্যোক্তা ও পরিচালকের সম্মিলিতভাবে কোম্পানির অন্তত ৩০ শতাংশ শেয়ার ধারণ করতে হবে। স্বতন্ত্র ও নির্বাহী পরিচালক বাদে প্রতিটি পরিচালককে ব্যক্তিগতভাবে অন্তত ২ শতাংশ শেয়ার ধারণ করতে হবে। পর্ষদের মোট পরিচালক সংখ্যার অন্তত এক-তৃতীয়াংশ অথবা ন্যূনতম তিনজন (যেটি বেশি) স্বতন্ত্র পরিচালক হতে হবে।
স্বতন্ত্র পরিচালকের যোগ্যতা ও শর্তাবলির বিষয়ে খসড়ায় বলা হয়েছে, স্বতন্ত্র পরিচালকরা সংখ্যালঘু শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ রক্ষায় নিরপেক্ষ তদারককারী হিসেবে কাজ করেন। একজন স্বতন্ত্র পরিচালক তিন বছরের জন্য নিযুক্ত হবেন এবং তিনি সর্বোচ্চ আরো একটি মেয়াদের জন্য পুনর্নিযুক্ত হতে পারেন। টানা দুই মেয়াদ (ছয় বছর) পূর্ণ করার পর পুনরায় নিযুক্ত হওয়ার আগে তিন বছরের একটি বিরতি থাকা বাধ্যতামূলক। স্বতন্ত্র পরিচালক পদপ্রার্থীদের ব্যবসা, করপোরেট ব্যবস্থাপনা, আইন বা একাডেমিয়া ক্ষেত্রে অন্তত ১২ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। তবে নারী স্বতন্ত্র পরিচালকদের ক্ষেত্রে এ অভিজ্ঞতার সীমা অন্তত আট বছর। কোনো ব্যক্তি যদি কোম্পানির উদ্যোক্তা হন, উদ্যোক্তা বা পরিচালকদের পরিবারের সদস্য হন অথবা গত তিন বছরের মধ্যে কোম্পানিতে কোনো নির্বাহী পদে আসীন থাকেন, তবে তিনি স্বতন্ত্র পরিচালক হতে পারবেন না।
বিশেষায়িত সুশাসন নিশ্চিত করতে পর্ষদকে অন্তত তিনটি সাব-কমিটি রক্ষণাবেক্ষণ করার কথা বলা হয়েছে খসড়া বিধিমালায়। এক্ষেত্রে অডিট কমিটি আর্থিক প্রতিবেদন এবং অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ তদারকির জন্য দায়ী থাকবে। এতে অন্তত তিনজন সদস্য থাকতে হবে, যারা সবাই নন-এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর এবং অন্তত একজন স্বতন্ত্র পরিচালক হওয়া আবশ্যক। নমিনেশন অ্যান্ড রেমুনারেশন কমিটি (এনআরসি) পরিচালকদের যোগ্যতা এবং পারিশ্রমিকসংক্রান্ত নীতিমালা তৈরি করবে। এ কমিটির চেয়ারম্যান অবশ্যই একজন স্বতন্ত্র পরিচালক হবেন। রিস্ক ম্যানেজমেন্ট কমিটি (আরএমসি) কোম্পানির ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা তৈরি এবং তদারকির দায়িত্বে থাকবে। অবশ্য ক্ষেত্রবিশেষে অডিট কমিটি এনআরসি ও আরএমসির দায়িত্ব পালন করতে পারবে।
কোম্পানির শীর্ষ ব্যবস্থাপনায় সুশাসন নিশ্চিত ও"ক্ষমতার পৃথক্করণের কথা বলা হয়েছে।"এক্ষেত্রে কোম্পানির চেয়ারম্যান এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) বা প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) পদ দুটি ভিন্ন ব্যক্তি দ্বারা পূরণ করতে হবে। পর্ষদকে অবশ্যই আলাদা ব্যবস্থাপনা পরিচালক, কোম্পানি সচিব, প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা এবং হেড অব ইন্টারনাল অডিট অ্যান্ড কমপ্লায়েন্স নিয়োগ করতে হবে। এ কর্মকর্তারা সাধারণত একই সঙ্গে অন্য কোনো কোম্পানিতে একই পদে আসীন হতে পারবেন না।
লভ্যাংশ বিতরণ ও স্বচ্ছতার বিষয়ে প্রস্তাবিত খসড়া বিধিমালায় বলা হয়েছে, অনুমোদনের ৩০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত লভ্যাংশ পরিশোধ করতে হবে। তিন বছর ধরে দাবিহীন অবস্থায় পড়ে থাকা লভ্যাংশ ক্যাপিটাল মার্কেট স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ডে (সিএমএসএফ) স্থানান্তর করতে হবে।
করপোরেট সুশাসন পরিপালনের বিষয়ে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোকে প্রতি বছর চার্টার্ড সেক্রেটারি ফার্ম থেকে একটি করপোরেট গভর্ন্যান্স কমপ্লায়েন্স সার্টিফিকেট গ্রহণ করতে হবে। কোম্পানিগুলোকে এখন পরিবেশগত, সামাজিক ও সুশাসন (ইএসজি) সংক্রান্ত বিষয়ে প্রতিবেদন দিতে উৎসাহিত করা হচ্ছে। এর মধ্যে করপোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (সিএসআর) নীতিমালা তৈরি করা এবং বার্ষিক প্রতিবেদনে এর বাস্তবায়ন চিত্র প্রকাশ করা অন্তর্ভুক্ত।